রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০৬:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
শ্রীলঙ্কায় গির্জা ও হোটেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণে বহু হতাহত নদী দখল-দূষণমুক্ত ও নাব্য ফেরাতে মাস্টার প্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত বৈশাখের আয়োজন দেখতে আসছেন ১০ দেশের সাংবাদিক এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন প্রশ্নফাঁসে বাতিল হলো কওমির দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা প্রাথমিকে ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী নুসরাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে পিবিআইয়ের সংবাদ সম্মেলন দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে লোটে শেরিং ৮ ঘণ্টা পর কুমিল্লা ইপিজেডের আগুন নিয়ন্ত্রণে শারীরিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ : সিঙ্গাপুরে নেয়া হচ্ছে না নুসরাতকে মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে বদলে যাচ্ছে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নের রং মালয়েশিয়ায় বাস খাদে পড়ে ৬ বাংলাদেশিসহ ১০ জন নিহত পহেলা বৈশাখ নিয়ে গুজব ছড়ালে ব্যবস্থা : আইজিপি অগ্নি নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশনা




তোমার জন্য খোলা জানালা

তোমার জন্য খোলা জানালা



সত্তুরের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী চার দশক এ দেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তিনি ছিলেন বাঙালির আনন্দ-বেদনা-ভালোবাসার অনন্য রূপকার; অনন্ত আকাশের হাতছানিকে আলিঙ্গন করে জীবনের সব গান শেষ করে গত মঙ্গলবার [২২ জানুয়ারি ২০১৯] আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল নীল আকাশে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন।

‘আমি কিছুই লিখি না, তোমরা আমাকে দিয়ে লেখাও। তোমাদের জীবনের গল্পই আমার গানের জন্ম ইতিকথা। তাই আমার ভেতর আমি নাই, আছো তোমরা… সঙ্গীত আমায় কাঁদায়, আমায় হাসায়, আমার ভালো লাগে ও আমার সঙ্গে যাই করে।’ কয়েক বছর আগে এভাবেই নিজের লেখা গান নিয়ে বলেছিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতব্যক্তিত্ব আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। একাধারে তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরস্রষ্টা এবং মিউজিক কম্পোজার। গানের জগতে সব্যসাচী। তিনি সারাজীবন গান নিয়ে গবেষণা করেছেন। একটা নির্ঝঞ্ঝাট, সমান্তরাল জীবনের বাসনা সবার মনে থাকে। কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে এমনও মানুষ আছেন, যারা একটু অন্যভাবেই বাঁচেন, জীবনযাপন করেন। তাই তাদের জীবন সম্পর্কে থাকে অন্যদের তীব্র কৌতূহল। বাংলা গানের জগতে তেমনই একজন মানুষ ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। যে কয়েকজন সঙ্গীতব্যক্তিত্বের হাতে বাংলা চলচ্চিত্রের গান মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তাদের একজন। কেবল একজন বললে ভুল বলা হবে, বলা উচিত শীর্ষস্থানীয়। তাই গানপ্রেমী তরুণ-যুবসহ সব প্রজন্মের তার প্রতি আগ্রহ থাকবেই। কারণ তিনি একজন অনুকরণীয় সঙ্গীতকার। ব্যক্তিজীবনে বোহেমিয়ান আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল নিজের জন্য কিছু করেননি। গানের মধ্য দিয়েই পুরো জীবন পার করেছেন। জীবনের প্রথম দিকে বেহালা ও গিটার বাজাতেন। তার লেখা প্রতিটি গানের মধ্যে থাকত গল্প। তিনি সব সময় বলতেন, ‘একজন গীতিকার গীতের আকারে মানুষের জীবনের গল্প আঁকেন। এই গল্প আঁকাগুলোকে জীবনী শক্তি দিতেই মানুষের অনেক কাছাকাছি থাকতে হয়।’ বেশ কয়েক বছর আগে তার এক জন্মদিনে জানতে চেয়েছিলাম, জীবনকে কীভাবে দেখেন? উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘এখন বছরগুলোকে মনে হয় মাস, মাসগুলো দিন, দিনগুলো যেন ক্ষণ। কারণ, বয়স বাড়ছে। সময় কমছে।’

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বালক বুলবুল রাইফেল কাঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে; দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে অনেক জনপ্রিয় গান লিখেছেন ও সুর করেছেন। ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘এই দেশ আমার’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘সেই রেললাইনের ধারে’- এমন বহু কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি। প্রেমের গানেও তিনি ছিলেন অনন্য। ‘ওই চাঁদ মুখে যেন’, ‘অনন্তপ্রেম’, ‘জীবন ফুরিয়ে যাবে’, ‘সাগরের মতোই গভীর’, ‘ঘুমিয়ে থাকো গো সজনী’- এত এত কালজয়ী গান পৃথিবীর আর কোনো সঙ্গীত পরিচালকের আছে কি-না জানা নেই। অথচ এই মানুষটি কি-না গত ২ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক পেজে একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও…তাই একটি ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম।’ তবে কি আগেই জেনেছিলেন, খুব অল্প সময় হাতে আছে তার! সময়ের স্রোতে অনেকেই হারিয়ে যায়, কিন্তু হারান না ওই মানুষগুলো যারা মানুষের জন্য নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে দেশ ও জাতির জন্য ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছেন। তাকে কি এত সহজে ভোলা যায়? যায় না। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তার যেসব সৃষ্টি রেখে গেছেন। তাকে কখনও ভোলা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন। তার গান কালের প্রবাহে জমা থাকবে। পরিশেষে বলি, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল-তোমার জন্য খোলা জানালা।

এন্ড্রু কিশোর

আমার বন্ধু কণ্ঠশিল্পী শেখ ইসতিয়াকের সূত্র ধরে পরিচয় হয়েছিল আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গে। আজ ইসতিয়াক ও বুলবুল ভাই দু’জনই নেই- এটা ভাবতেই ভীষণ কষ্ট লাগছে। বারবার পুরনো দিনের কথা মনে হচ্ছে। কবে, কীভাবে নতুন গানের আয়োজন নিয়ে আমরা মেতে উঠেছিলাম- সেসব দৃশ্য বারবার মনের পর্দায় ভাসছে। মনে আছে, বুলবুল ভাইয়ের সুর-সঙ্গীতে ‘আঁখি মিলন’ নামের একটি ছবিতে গান গাওয়ার কথা। তার সুরে এ ছবির ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’ গানটি দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এর পর বুলবুল ভাইয়ের সুরে গেয়েছিলাম বেলাল আহমেদ পরিচালিত ‘নয়নের আলো’ ছবিতে। এই ছবির ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’ গানটি যখন রেকর্ড করা হয়, তখন আমার কণ্ঠের অবস্থা ভালো ছিল না। কিন্তু তার পরও সেই গানই ছবির গল্পের পরিস্থিতির কারণে চূড়ান্ত করা হয়। এই গানও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পায়।

এর পর আর থেমে থাকা হয়নি। একের পর এক ছবিতে গান করে গেছি আমরা। বুলবুল ভাই বুঝতেন, ছবির চরিত্রের সঙ্গে গানের সমন্বয় কীভাবে করতে হয়। মনে আছে ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ ছবির ‘পড়ে না চোখের পলক’ গানটির কথা। 

বুলবুল ভাই আমাকে বলেছিলেন, এই গানটি রিয়াজের লিপে পর্দায় তুলে ধরা হবে। রিয়াজ তখন একেবারেই যুবক। তাই গানটি তার গলার উপযোগী করেই গাইতে হয়েছিল। গায়কী কেমন হবে সেটা বেশ ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বুলবুল ভাই। এভাবেই বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে বছরের পর বছর কাজ করে গেছি। আর এভাবেই একে অপরের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় গানগুলো।

ক’দিন আগেও বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তখনও বুঝিনি তিনি কতটা অসুস্থ। সেদিন আমাদের মধ্যে অনেক কথা হয়েছিল। নতুন কিছু কাজের পরিকল্পনাও করেছিলাম আমরা। কিন্তু সে পরিকল্পনা যে আদৌ বাস্তবায়িত হবে না- এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। বুলবুল ভাই আর নেই- মঙ্গলবার ঘুম থেকে উঠেই এমন একটি দুঃসংবাদ পাব, তা কল্পনাতেও ছিল না। কাজের একজন মানুষ এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবেন, তা সত্যিই ভাবা যায় না। এখনও মেনে নিতে পারছি না যে বুলবুল ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। 

কাছের মানুষকে হারানোর কষ্ট যে কী, তা সেদিন থেকে নতুন করে উপলব্ধি করছি। তাই প্রার্থনা করি, সঙ্গীতের এই বরপুত্র যেখানেই থাকুন, তার আত্মা যেন শান্তিতে থাকে। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যু নেই। তিনি তার সৃষ্টি করা অনবদ্য গানগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকবেন যুগের পর যুগ। তার গান থেকে যাবে। কিন্তু তার চলে যাওয়ায় সঙ্গীত অঙ্গনের যে শূন্যতা, তা থেকে যাবে দীর্ঘকাল। 

কনকচাঁপা

আমাদের আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আসলে বাংলার বুলবুল। একাধারে তিনি ছিলেন শক্তিমান লেখক, সুরস্রষ্টা এবং মিউজিক কম্পোজার। গানের জগতে তিনি ছিলেন সব্যসাচী। সারাজীবন গান নিয়ে গবেষণা করেছেন। আঞ্চলিক সুর থেকে শুরু করে আরব্য, পারস্য, ভারতীয়, স্পেনীয় সুর নিয়ে নাড়াচাড়া করে তার সঙ্গে নিজের ভালোবাসা মিশিয়ে সুরের আবহ তৈরি করেছেন। তার গানে প্রেম, বিরহ, কটাক্ষ, অনুরাগ, দেশপ্রেম, শিশুর সারল্য, সামাজিক নাটকীয়তা, বিদ্রোহ চাহিবামাত্র পাওয়া যেত। তাই ছবির গানের ফরমায়েশি জগতে তার কদর ছিল আলাদা। তার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল নিজেই গান লিখতেন, ফলে সুর আরও সুন্দর করে বসে যেত। মনে হতো এই গানের সুর ও কথা একসঙ্গেই যমজ হয়ে জন্ম নিয়েছে। তিনি আসলে একজন স্বভাবকবি ছিলেন। মুখে মুখে গান বানানোর অসম্ভব দক্ষতা তার ছিল। একই সঙ্গে নিজের সৃষ্টিকে অবহেলা করার দারুণ স্পর্ধাও ছিল। গান রেকর্ড হয়ে গেলে সে লেখা তিনি ছিঁড়ে ফেলতেন। আমরা আপত্তি জানালে বলতেন আমার গান আমি কেন সংগ্রহ করব। গান ভালো হলে কালের প্রবাহেই তা জমা থাকবে।

ব্যক্তিগত জীবনে বোহেমিয়ান টাইপের মানুষটা নিজের জন্য কিছুই করেননি। গান গান করেই জীবন পার করেছেন। অসম্ভব সাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা সারাজীবন তার গানেও অপার দেশপ্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ তুলে ধরেছেন। ছবির গানেও তিনি নিজে বায়না করে দেশের গান ঢোকাতেন। ভালো কণ্ঠের জন্য তিনি শিল্পী খুঁজে বেড়াতেন আজীবন। আমাকে তিনিই নিজে খুঁজে বের করেছিলেন। ৯২ সালের কথা, একটা অনুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পী শাকিলা আপা (শাকিলা শর্মা) বললেন কনক, বুলবুল ভাই তোকে খুঁজছেন, তাড়াতাড়ি যোগাযোগ কর। এর পর উনিই আবার ফোন দিলেন। তার সঙ্গে আমার প্রথম গান ছিল ‘সাদা কাগজ এই মনটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম’- মিলু ভাইয়ের সঙ্গে ডুয়েট। সেদিনই বুলবুল ভাই বললেন, ভাবি, ইনশাআল্লাহ অনেক গান হবে, আপনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব যে, কখনও পেছন ফিরে তাকাতে হবে না! সত্যিই সেদিন থেকেই আমার আর অবসর ছিল না। বুলবুল ভাই মাসে গড়ে প্রায় ১০টা ছবি হাতে নিতেন এবং তার বেশিরভাগ গান আমাকে দিয়েই গাওয়াতেন। নিজে অনেক গবেষণা করতেন; কিন্তু গানের কণ্ঠের ব্যাপারে নির্ভরশীল হতে চাইতেন। এর পর আসলেই আমাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তার সুরে গাওয়ার আমার প্রায় প্রতিটি গানই মাইলফলক হয়ে যাচ্ছিল। তার গানেই প্রায় সব পুরস্কার পাওয়া আমার! তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। 

image_print

সংবাদ শেয়ার করুন



মন্তব্য বন্ধ আছে।




ক্যালেন্ডার

এপ্রিল 2019
সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
« মার্চ    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  



© All rights reserved © 2017 Uttarancholsylhet.com
 
Design & Developed BY TC Computer