শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
সিলেট আ.লীগের নেতৃত্বে নতুন চমক! একজন ডায়নামিক লিডার আজাদুর রহমান আজাদ :: আশরাফুল হক রুমন জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কর পরিশোধ করা যাবে খালেদার জামিন চেয়ে ১৪০১ পৃষ্ঠার আপিল লেবাননে প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ, সংঘর্ষে নিহত ১ নবীগঞ্জে বিভিন্ন স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি আদায় গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির পাওনার বিষয়ে আদেশ সোমবার শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ : শিক্ষামন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে ট্রেন দূর্ঘটনায় আহত ৪ জনকে দেখতে নবীগঞ্জ হাসপাতালে ইউএনও ও পৌর মেয়র রেলপথ নিরাপদ ও উন্নত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে সরকার ‘আগামী বছরের মধ্যে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে’ তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালকসহ বরখাস্ত ৩ প্রবাসে বাংলাদেশি এলিন কালামের সাফল্য কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬




তালাক কী কেন ও কিভাবে

তালাক কী কেন ও কিভাবে



বিবাহ শুধু সামাজিক একটি প্রথা বা রীতিনীতিই নয়, বরং এটি একটি মহৎ ইবাদত। এটি আল্লাহর হুকুম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী করলে সাওয়াবও হয়। অন্য বিধানের মতো বিবাহও ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। তাই অন্য বিধান পালনে যেরূপ সে বিষয়ের জ্ঞান থাকা অপরিহার্য, যথা নামাজের জন্য তার আনুষঙ্গিক বিধান জানতে হয়, তদ্রূপ বিবাহ করতে হলেও তার আনুষঙ্গিক বিধানাবলি অবশ্যই জানতে হবে। দাম্পত্য জীবনের আচরণবিধি সম্পর্কে বিবাহের আগেই জ্ঞানার্জন করতে হবে। এটি এমন একটি সম্পর্ক যা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাকে কিভাবে সঠিকভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, কিভাবে সম্পর্কের উন্নয়ন হবে, আল্লাহ না করুন যদি সম্পর্কে অবনতি হয়, তাহলে কিরূপে মিল হবে অথবা জীবনের তাগিদে যদি সম্পর্ক ছিন্ন তথা তালাক দিতে হয়, তাহলে কিভাবে দিতে হবে—এরূপ যাবতীয় বিষয়ে জ্ঞানার্জন আবশ্যক। নচেৎ মনগড়া ও প্রচলিত ভুল রীতি অবলম্বনে নিজের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। পৃথিবীটা সংকীর্ণ হয়ে আসবে। নিজের অজ্ঞতার খেসারতই নিজেসহ গোটা পরিবার ও সমাজ ভোগ করবে।

তালাক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কেউ এর অপব্যবহার করলে কিংবা ভুল পন্থায় তা প্রয়োগ করলে সে একদিকে যেমন গুনাহগার হবে, অন্যদিকে তালাকও কার্যকর হয়ে যাবে। তাই প্রত্যেক বিবেচক স্বামীর দায়িত্ব হলো তালাকের শব্দ কিংবা এর সমার্থক কোনো শব্দ মুখে উচ্চারণ করা থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিরত থাকা। অতি প্রয়োজন ছাড়া স্বামীর জন্য যেমন তালাক দেওয়া জায়েজ নয়, তেমনি স্ত্রীর জন্যও তালাক চাওয়া নিষিদ্ধ। তালাকের পথ খোলা রাখা হয়েছে শুধু অতি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। বর্তমান সমাজে, বিশেষ করে আমাদের এতদঞ্চলে কোনো পরিবারে তালাকের ঘটনা যে কত বিশৃঙ্খলা, জুলুম, অত্যাচার এবং ঝগড়া-বিবাদের কারণ হয় তা বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই।

বিষয়টি যতটাই স্পর্শকাতর, আমাদের সমাজে ততটাই তার অপব্যবহারের হিড়িক চলছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সমাজে বিচ্ছেদ প্রবণতার এই ক্রমবর্ধমান বিস্তার কেন। সমাজবিজ্ঞানীরা নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নানা কারণ বর্ণনা করেছেন। তবে যে কথাটি প্রায় সবাই বলছেন তা হচ্ছে—ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব। ধর্মীয় অনুশাসনের বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, জীবনদর্শন, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক, একে অপরের হক সম্পর্কে সচেতনতা—এ সবই ধর্মীয় অনুশাসনের অন্তর্ভুক্ত। এরপর পর্দা রক্ষা, পরপুরুষ বা পরনারীর সঙ্গে মেলামেশা থেকে বিরত থাকা ইত্যাদিও বিশেষ ধর্মীয় অনুশাসন, যা পালন না করাও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতির কারণ। গবেষণা-পরিসংখ্যান বলছে ৮৭ শতাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে পরকীয়ার জেরে। কোনো ক্ষেত্রে স্বামীর পরকীয়া, কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রীর। এ ছাড়া তথ্য-প্রযুক্তির প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আধুনিক সংস্কৃতির কারণেও সংসার ভাঙছে। বর্তমানে মেয়েরা বিদেশি চ্যানেল ও বিভিন্ন ধরনের সিরিয়াল দেখে সাংস্কৃতিক দিক থেকে প্রভাবিত হচ্ছে।’

এহেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় হলো—

প্রথমত, ইসলামে যে সুসংহত জীবনব্যবস্থা রয়েছে, তার প্রতিটি অংশই অতি প্রয়োজনীয়। যে অংশ বাদ দেওয়া হবে তার কুফল ভোগ করতে হবে। একে অন্যকে কোনোভাবেই কষ্ট না দেওয়া, প্রত্যেকে অন্যের হক রক্ষায় সচেষ্ট থাকা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেরই রয়েছে কর্তব্য এবং অধিকার। নিজের কর্তব্য পালন আর অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হলেই সবার শান্তি আসবে।

দ্বিতীয়ত, শুধু পরিবারকেন্দ্রিক ইসলামী অনুশাসনগুলোই নয়, সাধারণ অনুশাসনগুলো মেনে চলারও গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন—মাদকাসক্তিও অনেক পরিবারের ভাঙনের কারণ। মাদক ইসলামী বিধানে হারাম।

তৃতীয়ত, নারী-পুরুষ উভয়ে যদি পর্দার বিধান মেনে চলে, তবে পরকীয়াজাতীয় কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকবে না। পর্দা বলতে শুধু সামনের মানুষটির সঙ্গেই পর্দা নয়; বরং এ ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে পর্দা লঙ্ঘিত হয় এবং তাও একসময় সংসার ভাঙার কারণ হয়ে থাকে। বিশেষত, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদির মতো তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যে বিশ্বব্যাপী কত সংসার ভাঙার কারণ ঘটেছে, তার সঠিক হিসাব হয়তো কোনো দিনই প্রকাশিত হবে না।

চতুর্থত, তালাক দেওয়ার অধিকার ইসলামে শুধু স্বামীকেই দেওয়া হয়েছে। স্ত্রীর হাতে এ জন্য দেওয়া হয়নি যে নারীদের স্বভাবে সাধারণত তাড়াহুড়া প্রবণতাটা একটু বেশি। তাই তাদের ক্ষমতা দিলে ছোটখাটো বিষয়েও তাড়াহুড়া করে তালাক দেওয়ার আশঙ্কাটা বেশি। তাই বেশি পরিমাণে বিবাহবিচ্ছেদ রোধেই ইসলাম নারীদের তালাকের ক্ষমতা দেয়নি। মনে রাখতে হবে, ইসলাম নারীকে তালাকের অধিকার দেয়নি, কিন্তু তালাকের যে মূল উদ্দেশ্য বিবাহবিচ্ছেদ, তার অধিকার দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো কারণে নারী চাইলে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে। ইসলামে নারীদের আটকে রাখা হয়নি, বরং তারাও প্রয়োজনে যথাবিহিত নিয়মে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারে। যথা :

ক. বিবাহের আগেই স্ত্রী এ শর্ত দিতে পারবে যে আমাকে ‘তালাক’ (বিবাহবিচ্ছেদ) দেওয়ার অধিকার দিতে হবে। তখন স্বামী থেকে প্রাপ্ত অধিকারবলে স্ত্রী প্রয়োজনে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারবে, যা আমাদের দেশের কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারায় উল্লেখ থাকে। (দেখুন : ফাতহুল কাদির : ৩/৪২৭)

খ. যদি বিবাহের সময় শর্ত না-ও দিয়ে থাকে, তার পরও স্ত্রী স্বামী থেকে আপসের ভিত্তিতে এমনকি প্রয়োজনে বিনিময়ের মাধ্যমেও তালাক নিতে পারবে। এটাকে ‘খোলা তালাক’ বলা হয়। (দেখুন : সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫২৭৩)

গ. ওই পদ্ধতিদ্বয় ছাড়াও স্বামী নপুংসক, পাগল, অস্বাভাবিক ক্রোধসম্পন্ন হলে কোনোক্রমেই মনের মিল না হলে বা নিখোঁজ হয়ে গেলে অথবা যেকোনো কঠিন সমস্যায় পতিত হলে স্ত্রী বিচারকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ করিয়ে নিতে পারবে। (শরহুস সগির, দরদির : ২/৭৪৫, কিফায়াতুল মুফতি : ৬/২৫২)

ইসলামে তালাকের অবস্থান
ইসলামী শরিয়তে অতি প্রয়োজনে তালাকের অবকাশ থাকলেও বিষয়টি অপছন্দনীয়। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় হালাল বস্তু হচ্ছে তালাক।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৭৭)

তাই নারী-পুরুষ উভয়ের কর্তব্য তালাক থেকে দূরে থাকা। তালাক দেওয়ার ক্ষমতা যেহেতু পুরুষের, তাই পুরুষকে ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাপারে খুবই সংযমী হতে হবে। অন্যদিকে নারীর ব্যাপারেও হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে নারী স্বামীর কাছে বিনা কারণে তালাক প্রার্থনা করে, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণ পর্যন্ত হারাম।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২০৫৫)

সম্প্রতি পরকীয়ার বিস্তারে যেমন পুরুষের অপরাধ আছে, তেমনি আছে নারীরও। দেখা যাচ্ছে, এক নারীর দ্বারাই অন্য নারীর সংসার ভাঙছে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর এই বাণী খুবই প্রাসঙ্গিক—‘কোনো নারী যেন তার বোনের (অপর নারীর) অংশ নিজের পাত্রে নেওয়ার জন্য তালাকের আবেদন না করে। সে নিজে পছন্দ মোতাবেক বিবাহ করুক, কেননা তার ভাগ্যে যা লেখা আছে সে তা-ই পাবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৬০০)

তাই প্রত্যেকের কর্তব্য, নিজের পাতে যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। অন্যের পাতের জিনিস নিজের পাতে নিয়ে নেওয়ার মতো লোভী মানসিকতা কোনো ভদ্র মানুষের হতে পারে না। উপরন্তু যখন ওই নারীটিও একজন নারী।

দাম্পত্য সম্পর্কের দৃঢ়তায় ইসলামের দিকনির্দেশনা
যেসব কারণে দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়, সেগুলো দূর করার জন্য কোরআন-হাদিসে অনেক নির্দেশনা রয়েছে।

প্রথমত, বিবাহের আগে একে অন্যকে ভালোভাবে দেখে নেবে, যাতে বুঝে-শুনেই বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং কোনো ধরনের দৈহিক ত্রুটির কারণেই যেন সম্পর্ক ছিন্ন করার উপক্রম না হয়।

দ্বিতীয়ত, শুধু একে অন্যের দোষ-ত্রুটির দিকেই দেখবে না, বরং তার মধ্যে যেসব ভালো গুণ বিদ্যমান সেগুলোর দিকে তাকিয়ে অপছন্দের দিকগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তাকে তোমার অপছন্দও হয়, তবু তুমি যা অপছন্দ করছ আল্লাহ তাতে সীমাহীন কল্যাণ দিয়ে দেবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন নারীর ওপর রুষ্ট হবে না, কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার ওপর সে সন্তুষ্ট হতে পারবে।’ (মুসলিম হাদিস : ১৪৬৯)

স্ত্রীকে সংশোধনের কয়েকটি নির্দেশনা
যদি স্ত্রী স্বামীর আনুগত্য না করে, হক আদায় না করে, বরং উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে স্বামীর দায়িত্ব হলো তাকে সংশোধনের সর্বাত্মক চেষ্টা করা। শরিয়ত এ ধরনের স্ত্রীকে সুশৃঙ্খল জীবনে ফিরিয়ে আনতে কিছু দিকনির্দেশনাও দিয়ে দিয়েছে। প্রথমে সেগুলো অনুসরণ করবে। তার পরও যদি স্ত্রীর মধ্যে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে চূড়ান্ত ফয়সালা তালাকের পথ বেছে নিতে পারবে।

প্রথম পদক্ষেপ : প্রথমেই উত্তেজিত হবে না; বরং নিজেকে সংযত রাখবে এবং মিষ্টি কথায় স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। মায়া-ভালোবাসা প্রকাশ করে মন গলানোর চেষ্টা করবে। কোনো ভুল ধারণায় থাকলে যথাসম্ভব তা দূর করার চেষ্টা করবে। মায়া-মমতার মাধ্যমে যত দূর সম্ভব দাম্পত্য জীবন স্থায়ী করার আপ্রাণ চেষ্টা করবে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ : ওই পদক্ষেপের মাধ্যমে কাজ না হলে রাগ-অনুরাগ প্রকাশের উদ্দেশ্যে স্ত্রীর সঙ্গে রাত যাপন থেকে বিরত থাকবে। ঘুমানোর জায়গা পৃথক করে নেবে। যদি এতে সতর্ক হয়ে যায় এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয় তাহলে দাম্পত্য জীবন সুখের হবে।

তৃতীয় পদক্ষেপ : উল্লিখিত দুটি পদক্ষেপ গ্রহণের পরও কোনো কাজ না হলে তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে শরিয়ত স্ত্রীকে হালকা শাসন, হাত ওঠানোর অনুমতি দিয়েছে। তবে ক্ষিপ্ত হয়ে নয়; বরং অন্তরে মহব্বত পোষণ করে বাহ্যিকভাবে স্ত্রীকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে তা করবে। তবে যেন এতে তার শরীরে কোনো দাগ না পড়ে এবং চেহারা বা স্পর্শকাতর কোনো স্থানে আঘাত না আসে।

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও। তারপর তাদের শয্যা বর্জন কর। অতঃপর তাদের সামান্য প্রহার কর। (অর্থাৎ এমনভাবে হালকা প্রহার করবে যাতে শরীরে কোনো যখম বা আঘাত না হয় এবং মুখে ও লজ্জাস্থানে কখনো প্রহার করবে না। (মুজামে তাবরানি, হাদিস : ২১৩০) যদি তারা অনুগত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অন্বেষণ করো না।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৩৪)

অবশ্য রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের এ ধরনের শাস্তি দেওয়া পছন্দ করেননি। কেউ কেউ স্ত্রীকে শাসনের নামে বেধড়ক মারপিট করে থাকে, যা শরিয়ত সমর্থিত নয় এবং তা সুস্পষ্ট জুলুম।

চতুর্থত ও সর্বশেষ পদক্ষেপ : উল্লিখিত তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণের পরও কোনো কাজ না হলে চতুর্থ পদক্ষেপ হিসেবে নির্দেশ হলো—উভয় পক্ষ থেকে এক বা একাধিক সালিসের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করবে। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ সৃষ্টির আশঙ্কা কর, তবে মীমাংসার জন্য পুরুষের পরিবার থেকে একজন সালিস ও নারীর বংশ থেকে একজন সালিস পাঠিয়ে দেবে। তারা দুজন যদি মীমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে দেবেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৫)

তালাক হলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আর যদি পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে—মীমাংসা ও সংশোধনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, কোনোক্রমেই একমতে পৌঁছা সম্ভব না হয়—এ রকম চূড়ান্ত পর্যায়ে গেলে শরিয়ত স্বামীকে তালাক দেওয়ার এখতিয়ার দিয়েছে। তালাক অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ হলেও তা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা না থাকলে শরিয়ত সমর্থিত পদ্ধতিতে তালাক দেবে।

তালাক দেওয়ার শরিয়ত নির্দেশিত পদ্ধতি
কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসারে তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো—স্ত্রী যখন হায়েজ (মাসিক) থেকে পবিত্র হবে তখন স্বামী তার সঙ্গে সহবাস না করে সুস্পষ্ট শব্দে এক তালাক দেবে। যেমন—আমি তোমাকে এক তালাক দিলাম। এরপর স্বামী যদি স্ত্রীকে ইদ্দত চলাকালীন ফিরিয়ে নিতে চায় তাহলে তা পারবে। আবার স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কায়েম হয়ে যাবে। অন্যথায় ইদ্দত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং স্ত্রী স্বামী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে। তখন স্ত্রী ইচ্ছা করলে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে। তালাক দিতে একান্ত বাধ্য হলে এই পদ্ধতিতে তালাক দেওয়া কর্তব্য।

শরিয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে তালাক দেওয়ার সুফল
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তালাকের পরে দাম্পত্য জীবনের সুখ-শান্তির কথা মনে পড়ে পরস্পরের গুণ ও অবদান স্মরণ করে উভয়েই অনুতপ্ত হয় এবং বৈবাহিক সম্পর্ক পুনর্বহাল করার  আপ্রাণ চেষ্টা করে। যদি শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী এক তালাক দেওয়া হয়, তাহলে এ আশা পূরণ হওয়ার সুযোগ থাকে এবং আবার বৈবাহিক জীবন শুরু করতে পারে। এ পদ্ধতিতে দীর্ঘ সময় স্ত্রীকে পুনঃ গ্রহণের অবকাশ পাওয়া যায় এবং তালাকের কারণে সৃষ্ট সমস্যা নিয়েও ভাবার সুযোগ থাকে।

আর যদি ইদ্দত শেষ হয়ে বিচ্ছেদের পর আবার তারা দাম্পত্য জীবনে ফিরে আসতে চায়, তাহলে নতুন মহর ধার্য করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এ ক্ষেত্রে অন্যত্র বিবাহের প্রয়োজন হবে না। দুর্ভাগ্যবশত, দ্বিতীয়বারও তাদের মধ্যে বনিবনা না হলে এবং আবার তালাকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সে ক্ষেত্রেও ইসলামের নির্দেশনার পূর্ণ অনুসরণ করে ওই সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

উল্লেখ্য, তালাকের সময় স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত তার ইদ্দতের সময়। আর গর্ভবতী না হলে তিন হায়েজ (মাসিক) অতিক্রম হওয়া পর্যন্ত।

তবে স্বামী যেহেতু স্ত্রীকে দুই ধাপে দুই তালাক প্রদান করেছে, তাই এখন শুধু একটি তালাক তার অধিকারে আছে। এই তৃতীয় তালাক প্রদান করলে আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না এবং আবার বিবাহও করতে পারবে না। কেননা এই সুযোগ দুই তালাক পর্যন্তই সীমিত। যে ব্যক্তি উপরোক্ত পদ্ধতিতে দুই তালাক দেওয়ার পর আবার বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করবে, তাকে আগামী দিনগুলোতে খুব হিসাব-নিকাশ করে চলতে হবে। একটু অসতর্কতার কারণে তৃতীয় তালাক দিয়ে ফেললে আর এই স্ত্রীকে নিয়ে ঘর-সংসার করার সুযোগ থাকবে না; বরং সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যাবে।

শরিয়তের নির্দেশনা অমান্য করার কুফল
এভাবেই ইসলামী শরিয়ত বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট রাখার অবকাশ দিয়েছে। কিন্তু মানুষ শরিয়তের এই সুন্দর পদ্ধতি উপেক্ষা করে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব শ্রেণির লোকদের মধ্যেই এ প্রবণতা দেখা যায় যে, তারা যখন রাগে ক্ষোভে লিখিত বা মৌখিকভাবে তালাক দেয় তখন একসঙ্গে তিন তালাকই দিয়ে থাকে। তিন তালাক দিলে ইদ্দত চলাকালেও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না এবং ইদ্দতের পরেও নতুনভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকে না। একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। এমতাবস্থায় অনুতপ্ত হওয়া এবং আপসের জন্য আগ্রহী হওয়া কোনো কাজে আসে না।

যারা তিন তালাক দেওয়ার পর শরিয়তের বিধান জানতে মুফতি সাহেবদের কাছে আসে, তাদের অনেককেই দেখা যায় অত্যন্ত অসহায়ত্বের সঙ্গে নিজের দুঃখের কথা বলে মুফতি সাহেবের মন গলাতে চেষ্টা করে। নিষ্পাপ সন্তানদের কথা বলে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করতে থাকে—যেভাবেই হোক কোনো হিল্লা-বাহানা বের করে তার পরিবারটিকে যেন ধ্বংস থেকে বাঁচানো হয়। কিন্তু এসব আবদার-অনুরোধ বিফল। তার নিজ হাতেই সব সুযোগ বিনষ্ট হয়েছে। তালাক দেওয়ার শরিয়তসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ না করার কারণে স্ত্রী তার জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছে। উপরন্তু শরিয়তের নিয়ম অমান্য করে মারাত্মক গুনাহ করা হয়েছে। আর অন্যায়ভাবে তালাক দেওয়ায় স্ত্রীর ওপর চরম জুলুমও করা হয়েছে, যা আরেকটি কবিরা গুনাহ। এখন আবার তাকে স্ত্রীরূপে ফিরে পাওয়ার যে সম্ভাবনাটি রয়েছে তা অত্যন্ত দূরবর্তী সম্ভাবনা।

প্রচলিত হিল্লা বিয়ে ইসলামে নিষিদ্ধ
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তিন তালাকের পরই স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নানা রকম হিল্লা-বাহানার আশ্রয় নেওয়া শুরু করে। এটা যেমন অশালীন, তেমনি শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ ও লানতযোগ্য কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘(হিল্লা-বাহানার মাধ্যমে) অন্যজনের জন্য স্ত্রী হালাল করার উদ্দেশ্যে বিবাহকারী এবং যার জন্য হালাল করা হয়েছে—উভয়ের ওপরই আল্লাহর লানত।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২০৭৬)

যদিও এমতাবস্থায় ওই নারী অন্যত্র বিবাহ করে সেই স্বামীর সঙ্গে সহবাসের পর স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হলে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে। তবে এ পদ্ধতি গ্রহণ করা অত্যন্ত ঘৃণিত।

উপরন্তু হিল্লা-বাহানা গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামের দুশমনদের ইসলামের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। তারা হিল্লা বিয়ে নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে থাকে। অথচ ইসলাম এ ধরনের হিল্লা বিয়ের অনুমতিই দেয় না। ইসলামে নিষিদ্ধ একটি হীন কাজের দায় ইসলামের ওপর চাপিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। আর এটি হয়েছে শুধু এসব নাদান মুসলমানের কারণে। ইসলামের বিধান হলো—তিন তালাকের পর উভয়ে উভয়ের রাস্তা ধরবে। স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে নেবে। তদ্রূপ স্ত্রীও ইদ্দত শেষে অন্যত্র বিয়ে করে তার সঙ্গেই ঘর-সংসার করবে। স্ত্রী প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার বা স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে কোনো হিল্লা-বাহানা করা অবৈধ। হ্যাঁ, কোনো কারণে যদি দ্বিতীয় স্বামী কখনো তালাক দিয়ে দেয় বা মারা যায়, তখন ইদ্দত শেষে চাইলে সে আবার প্রথম স্বামীর কাছে যেতে পারবে। ইসলামের এই স্বচ্ছ বিধানের সঙ্গে প্রচলিত হিল্লা বিয়ের কী সম্পর্ক?

মুফতি মাহমুদ হাসান

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদ শেয়ার করুন



মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সংবাদদাতা প্রতিনিধি আবশ্যক অনলাইন

apply




জরুরি হটলাইন

ক্যালেন্ডার

ডিসেম্বর 2019
সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
« নভে.    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930



© All rights reserved © 2017 Uttarancholsylhet.com
 
Design & Developed BY TC Computer
Translate »