বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
সিলেটে অনলাইন সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের রেজিষ্ট্রেশন শুরু টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ কেবল জিম্বাবুয়েই ট্রাম্পের জন্য তালেবানদের দরজা খোলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ছে, রপ্তানিও শুরু মিয়ানমার কারও কথা শোনে না : পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেরেই যাচ্ছেন নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বেনি গ্যান্তেজ আমাদের কাজই হচ্ছে জনগণকে সেবা দেয়া : প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীতে মা-ছেলে হত্যায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড বাবার মোটরসাইকেলে চড়ে আদালতে মিন্নি প্রেমিকের মৃত্যুর খবরে গলায় ফাঁস দিলো প্রেমিকা জাকির নায়েককে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য মাহাথির মোহম্মদের কিশোরগঞ্জে জাল সার্টিফিকেট ও এমপির সিলমোহর উদ্ধার গোয়াইনঘাটে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নাসির বিড়িসহ গ্রেফতার ১ আল-তাজিদ ফাউন্ডেশন ইউ কের উদ্যোগে হুইল চেয়ার ও রিকশা বিতরণ কমলগঞ্জে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ




ঝিনুক নেই মোতিও নেই

ঝিনুক নেই মোতিও নেই



চলনবিলে আর ঝিনুক মেলে না। ঝিনুকের মোতিও মেলে না। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর প্রবল জনপ্রিয় গান ‘ভালো আছি ভালো থেকো’তে যেমন ঝিনুকের খোলসের আবরণে মুক্তার সুখের কথা বলা হয়েছে, চলনবিলের চুইন্যাদের সেই সুখ আর নেই।

১৫-২০ বছর আগের কথা। বিলের বিভিন্ন এলাকায় ফুটত হাজার হাজার শাপলা-শালুক ফুল। এক মানুষের বেশি পানির গভীরতা। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-যুবক থেকে বয়স্করা যেতেন ঢ্যাপ-শালুক তুলতে। চোখে পড়ত তালগাছের তৈরি অসংখ্য ডিঙি, আর কাঠের তৈরি ছোট ছোট ভোট (নৌকা)। তারা সংগ্রহ করতে যেত শাপলা, ঢ্যাপ, শালুক আর ঝিনুক। শাপলা ফুল বা ঢ্যাপ তোলা যেত নৌকা থেকেই। কিন্তু শালুক তুলতে নামতে হতো পানিতে। ডুব দিয়ে শালুক তুলতে গিয়ে খোঁজ মিলত ঝিনুকেরও। কিন্তু সেই দিন হারিয়ে গেছে। এখন ঝিনুক তো দূরের কথা, শাপলা-শালুকেরও দেখা মেলে না চলনবিলে; বরং গ্রামের কাছাকাছি এলাকায় কচুরিপানার রাজত্ব। পানিতে ভাসা আমন ধানকে কচুরিপানা ঠেসে ধরে। গ্রাম থেকে নৌকা নিয়ে বের হতেও বেগ পেতে হয়।

নাটোরের সিংড়া উপজেলার ছোট চৌগ্রামের মানুষের সঙ্গে আলাপ করে এমন চিত্রই পাওয়া গেল। সিংড়া সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে এ গ্রাম। গ্রামে আছে চুইন্যাপাড়া। একসময় মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই ঝিনুক থেকে চুন তৈরি করত। কিন্তু এ গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ের ১০-১৫ জনও চুনের ব্যবসায় জড়িত। নৃপেন তামাল, গোপেন তামাল, উপেন তামাল, আবুল কালাম আজাদ, আবদুস সালাম, হোসেন আলী প্রামাণিক তাদের ক’জন। সবাই যাকে ঝিনুক বলে, এ এলাকার মানুষ তাকে বলে আঁচড়া।

সিংড়া থেকে ছোট চৌগ্রাম যেতে বেশ আঁকাবাঁকা রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে কোনো দিকে বিশাল শুকনো মাঠ, কোনো দিকে পানি আর পানি। গ্রামে পৌঁছে গোড়ায় শান বাঁধানো একটা ছোট বটগাছের নিচে দাঁড়াতেই দেখা কালামের সঙ্গে। তিনি পাশের বাজার থেকে দুই বস্তা আঁচড়া নিয়ে ফিরছিলেন। আমাদের ইশারায় কাঁধের বাঁক নামিয়ে গাছের নিচে পাশে বসলেন। ৩২ বছর বয়সী কালাম ১৬ বছরই কাটাচ্ছেন হাতে চুন মেখে। তার বাবা কবেজ ফকিরও চুনের ব্যবসা করতেন। বড় ভাই আবদুস সালামও করেন। কালামের কাছ থেকে জানা গেল, একসময় চলনবিলে প্রচুর আঁচড়া পাওয়া যেত। অনেক মানুষ চুন বানাত। ব্যবসাও ছিল জমজমাট। কিন্তু ১৫-২০ বছর হলো আঁচড়া পাওয়া যায় না। তবে হাঁসকে খাওয়ানোর জন্য ছোট-বড় শামুক পাওয়া যায় ইচ্ছামতো।

তাহলে চুন তৈরি করেন কী দিয়ে? শোনা যায় শামুক দিয়েও চুন বানানো হয়? এমন প্রশ্ন করা হলে কালাম বললেন- ‘না, আঁচড়া থাইক্যাই চুন বানাইন্যা হয়। শামুকের চুন খাওয়াইলে মানুষ মারব!’ তিনি জানালেন, খুলনা থেকে পাইকাররা আঁচড়া এনে বাজারে বসে। তাদের কাছ থেকে এ গ্রামের মানুষ কিনে আনেন। এক মণ আঁচড়া কেনেন এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়। সাত মণ চুন বানানো যায় এক মণ আঁচড়া থেকে। বিক্রি করেন ৪০ টাকা কেজি। তাতে ভালোই পোষায়। হাটে হাটে গিয়ে বিক্রি করেন তারা। যান রানীনগর, নন্দীগ্রাম, কুন্দারহাটে। গাওয়ালও করেন। হাঁক ডেকে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বেড়ান। দিনে কম করে হলেও ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার চুন বিক্রি করা যায়। লাভ থাকে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

এটা তো আপনাদের নিজস্ব পেশা নয়। অন্য কাজের চেয়ে এতে লাভ কি খুব বেশি যে এ পেশায় এলেন? কালাম জানালেন, লাভ বেশি না হলেও সংসার চলে। আগে চলত না। বাবা মারা যাওয়ার পর দুই ভাই পৃথক হয়ে যান। ভাগে পান মাত্র আড়াই বিঘা জমি। দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সংসার। জমির ফসল থেকে দিন চালানো কঠিন হয়ে যায়। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়ে আরও বেকায়দায় পড়েন কামাল। তখন শুরু করেন চুনের ব্যবসা।

বাবার পর আপনি চুন ব্যবসায়, ছেলেকেও কি এ কাজেই নামাবেন? প্রশ্ন শেষ না হতেই মাথা ঝাঁকি মেরে বললেন- ‘বেটাকে পড়াচ্ছি। তাকে এ কাম করব্যার দেবো না।’ একটু দূরেই ছোট চৌগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখিয়ে বললেন, ‘বেটা এখানে ফাইভে পড়ে। আল্লায় দিলে ওকে অনেক দূর পড়াব।’ কালাম ফকির এও জানালেন, চুনের ব্যবসার পাশাপাশি তিনি জমি চাষ করেন, বিল থেকে মাছ ধরে বিক্রি করেন। এতে দিন ভালোই কাটে।

চলনবিলের ঝিনুকে মোতি (মুক্তা) পাওয়ার কথা জানতে চাইলে কালাম বলেন, ‘ওসব মিছা কথা। হয়তো কোনোকালে পাওয়া যাইত। এখন আঁচড়াই পাই না, মোতি পাব কোন্‌ থাইক্যা?’

কালামের সঙ্গে কথা শেষ না হতেই মাঝখানে ঢুকলেন হোসেন আলী প্রামাণিক। ৭৫ বছর বয়সী ধবধবে সাদা দাঁড়ির হোসেন আলী বললেন, ‘অরা কিচ্ছু জানে না, সব পাওয়া যাইত। খালি বিলে না, পুকুরেও একসময় বড় বড় আঁচড়া পাওয়া যাইত। তার মইদ্যে বড় বড় মোতি থাইকত। মহাজনরা গাঁওয়ালে আইস্যা কিন্যা নিয়া যাইত।’

হোসেন আলীর কাছে ঝিনুক থেকে চুন বানানো, আর চুইন্যাদের সুখদুঃখের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চুন বানাইন্যা কিছুই না। আঁচড়া কাঠ-খড়কুটা দিয়্যা পোড়ায়্যা, ছাপ কইর‌্যা গুঁড়া বানাইয়্যা পানি মিশ্যালেই চুন হয়্যা গেল।’ চট করে চুন বানানোর গল্প বলার পেছনে রয়েছে হোসেন আলীর বিশাল অভিজ্ঞতা। তিনি ১৯-২০ বছর বয়স থেকে চুনের ব্যবসা করেন। দেখেছেন অনেক কিছু। তাই পোড়খাওয়া বৃদ্ধ অনায়াসে বলতে পারলেন, ‘এক সোমায় সব আছিল। আঁচড়া আছিল বইল্যা চুইন্যাগারে দিন আছিল। আঁচড়ার মোতি, শাপলার ঢ্যাপ, শালুক- সব আছিল। কিন্তুক এখন আর সেই দিন নাই।’

image_print

সংবাদ শেয়ার করুন



মন্তব্য বন্ধ আছে।

সংবাদদাতা প্রতিনিধি আবশ্যক অনলাইন

apply 




Translate:

জরুরি হটলাইন

ক্যালেন্ডার

সেপ্টেম্বর 2019
সোম বুধ বৃহ. শু. শনি রবি
« আগস্ট    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  



© All rights reserved © 2017 Uttarancholsylhet.com
 
Design & Developed BY TC Computer
Translate »